সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বর্তমান বিশ্বে একটি আলোচিত নাম। মানুষের পারস্পরিক যোগাযোগ ও যেকোনো তথ্যের দ্রুততম আদান-প্রদানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি হলো, সোস্যাল নেটওয়ার্কিং বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম। কম্পিউটার, স্মার্টফোন এবং আইফোনের মাধ্যমে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যুক্ত হওয়া যায়। এক্ষেত্রে অপরিহার্য জিনিস হচ্ছে ইন্টারনেট। ইন্টারনেটের মাধ্যমে খুব সহজেই আমরা পৃথিবীর একপ্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে সংযুক্ত হতে পারি।

Source: entrepreneur.com

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আমরা আমাদের যেকোনো ব্যক্তিগত মতামত, তথ্য, ছবি, ভিডিও এবং তাৎক্ষণিক অনুভূতি প্রকাশ কিংবা আদান-প্রদান করতে পারি। তরুণ প্রজন্মের কাছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো তুমুলভাবে জনপ্রিয়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের মধ্যে রয়েছে, ফেসবুক, টুইটার, ভাইবার, ইন্সটাগ্রাম, উইচ্যাট, ম্যাসেঞ্জার ইত্যাদি। প্রযুক্তির প্রসার লাভের ফলে পৃথিবী একটি গ্লোবাল ভিলেজে পরিণত হয়েছে। বিশ্বগ্রাম বা গ্লোবাল ভিলেজ মূলত এমন একটি ধারণা যেখানে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের লোকজন পরস্পরের সঙ্গে ইলেট্রনিক যোগাযোগের মাধ্যম, যেমন: টেলিভিশন, রেডিও, মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট ইত্যাদিতে যুক্ত থাকে। তাই পৃথিবীর এক প্রান্তের মানুষের সঙ্গে অপর প্রান্তের মানুষের যোগাযোগ যেমন সাবলীল এবং কম সময়সাপেক্ষ সম্ভব হয়েছে, ঠিক তেমনি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে প্রযুক্তি উপরে নির্ভরতা। মানুষ এখন আর আগের মতো পত্রিকার পাতায় চোখ বুলায় না।

Source: everydayhealth.com

পত্রিকার বদলে এসেছে অনলাইনভিত্তিক বিভিন্ন নিউজ পোর্টাল এবং ইউটিউব। ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের মালিক, লেখক, কবি, সাহিত্যিকেরাও স্রোতের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে নিজের প্রচার-প্রচারণা কিংবা অনুভূতি প্রকাশ করছে। বর্তমানে ডিজিটাল মার্কেট প্লেসের জন্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো একটি বড় প্লাটফর্ম। এ মাধ্যমগুলো ব্যবহার করে খুব সহজেই নিজের ব্যবসায়িক পণ্যের প্রচার-প্রচারণা করা যায়। চলুন, আমরা এ আর্টিকেলটি থেকে জেনে নিই, কীভাবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে ডিজিটাল মার্কেটিং করা সম্ভব।

১. ফেসবুক

সবচেয়ে জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম হলো ফেসবুক। ২০০৪ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মার্ক জাকারবার্গ ক্ষুদ্র পরিসরে ফেসবুক প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তীতে বিশ্বব্যাপী ফেসবুক তুমুল জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। সারা বিশ্বে ফেসবুক ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় ২০৪ কোটি ৭০ লাখ। আমেরিকার প্রায় ৮৪শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক লোক ফেসবুক ব্যবহার করে থাকে। বাংলাদেশে সর্বস্তরের লোক এ মাধ্যমটি ব্যবহার না করলেও সংখ্যাটি একেবারেই কম নয়।

Source: sproutsocial.com

বন্ধু খোঁজা, চ্যাটিং, বিভিন্ন গ্রুপে অংশগ্রহণ ইত্যাদি কারণে, এ মাধ্যমটি সর্বাধিক গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে। বর্তমানে মার্কেটিংয়ের জন্যও ফেসবুক ব্যবহৃত হচ্ছে। যেহেতু ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের বেশিরভাগই ফেসবুক ব্যবহার করে, তাই এ মাধ্যমটি হতে পারে আপনার ডিজিটাল মার্কেটিংয়ের প্রধান হাতিয়ার। এ জন্য অবশ্যই সঠিক পরিকল্পনা এবং কৌশল অবলম্বন প্রয়োজন। ফেসবুকে নিজের সর্বাধিক গ্রহণযোগ্যতা তৈরি ও মার্কেটিং করার জন্য বেশ কিছু বিষয়ে লক্ষ্য রাখতে পারেন। যেমন-

ছবি ও ভিডিও ব্যবহার

ফেসবুকে কীভাবে কোন তথ্য কার কাছে পৌঁছাবে, সেটি বিশেষ প্রকার প্রোগ্রামিংয়ের মাধ্যমে পূর্বেই নির্ধারণ করা হয়ে থাকে। ফেসবুকের এই এলগরিদম যেকোনো সময় পাল্টে যেতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, ফেসবুক এখন ভিডিও ও ছবিকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিচ্ছে। সাধারণ পোস্টের তুলনায় ভিডিও এবং ছবি খুব সহজেই মানুষের দৃষ্টিগোচর হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, ফেসবুকে ছবি পোস্ট করলে সাধারণত ৫৩শতাংশ বেশি লাইক পাওয়া যায়।

Source: digitalmarketinginstitute.com

এছাড়াও, ছবিভিত্তিক পোস্টে সাধারণত ৮৪শতাংশ লাইক বেশি পাওয়া যায়। তাই বিভিন্ন মজাদার, আকর্ষণীয় এবং শিক্ষণীয় ছবি এবং ভিডিও ব্যবহারের মাধ্যমে খুব সহজেই মানুষের নজরে আসা যায় এবং ফেসবুকে নিজের ব্যবসার গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানো যায়।

বিভিন্ন গ্রুপে অংশগ্রহণ

একটি ফেসবুক গ্রুপে সাধারণত অসংখ্য মানুষের সংশ্লিষ্টতা থাকে, যার ফলে কোনো গ্রুপে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণের মাধ্যমে নিজের চিন্তা-ভাবনা, দৃষ্টি-ভঙ্গি ও মতামত খুব সহজেই অসংখ্য মানুষের সঙ্গে আদান-প্রদান করা যায়। উদাহরণস্বরূপ, আপনি যদি লেখক হয়ে থাকেন ,তাহলে আপনার লেখাটি ফেসবুকে লেখালেখি সংশ্লিষ্ট গ্রুপে শেয়ার করতে পারেন। এতে আপনার লেখাটি খুব সহজেই অনেক মানুষের কাছে পৌঁছে যাবে। আবার ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে নির্দিষ্ট গ্রুপে, আপনি আপনার পণ্যের সুযোগ-সুবিধা সর্ম্পকে সবাইকে অবগত করতে পারেন। এতে মানুষ আপনার পণ্যের ব্যাপারে খুব সহজেই আকৃষ্ট ও আগ্রহী হবে।

মেধার সর্বোচ্চ প্রয়োগ

ফেসবুক একটি বিনোদনের মাধ্যম হলেও, এখানে সফল হওয়ার জন্যও চাই মেধার সঠিক ব্যবহার। যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্লেষক ফার্ম কিসমেট্রিকসের মতে, পোস্টে লেখার ব্যাপ্তি লাইক পাবার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। যেমন: ৮০ শব্দের মধ্যে পোস্ট দিলে প্রায় ৬৬শতাংশ মানুষের সম্পৃক্ততা বেড়ে যায়।

Source: bluefountainmedia.com

নিয়মিত পোস্ট দিলে ফেসবুক ব্যবহারকারীদের আপনার প্রোফাইলটি খুব সহজেই নজরে আসবে। এছাড়াও তথ্যবহুল এবং সাম্প্রতিক খবরের উপর মানুষের আগ্রহ বেশি থাকে। আবার বিভিন্ন উৎসবগুলোকে কাজে লাগাতে পারেন। পোস্টের টাইমিংও অনেক গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণত ছুটির দিনে, রাতের খাবারের পরে, সন্ধ্যায় কাজ থেকে ফেরার পরে মানুষ ফেসবুকে বেশি সক্রিয় থাকে; তাই এই সময়গুলো কাজে লাগান। ই-কমার্স কিংবা যেকোনো ব্যবসার মার্কেটিংয়ের জন্য ফেসবুক ম্যাসেঞ্জারও ব্যবহার করতে পারেন।

২. ইউটিউব

ড্রিম-গ্লোয়ের গবেষণা অনুযায়ী সক্রিয় ব্যবহারকারীর সংখ্যা অনুসারে ইউটিউব দ্বিতীয় বৃহৎ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম। বিশ্বব্যাপী ইউটিউব ব্যবহারকারী মানুষের সংখ্যা প্রায় ১৫০ কোটি। ইউটিউবে জনপ্রিয়তার মানদন্ড হিসাব করা, আপনার কতজন সাবস্ক্রাইবার আছে তা দিয়ে। প্রতি মিনিটে অসংখ্য ভিডিও ইউটিউবে আপলোড করা হচ্ছে। কিন্তু আপলোডকারীদের মধ্যে বেশিরভাগই নিজের সাবস্ক্রাইবার বাড়ানোর জন্য কোনো কৌশল অবলম্বন করেন না।

Source: simplilearn.com

বেশ কিছু কৌশল অবলম্বনের মাধ্যমে আপনিও খুব সহজে এ যোগাযোগ মাধ্যমে নিজের প্রভাব বাড়াতে পারেন। ড্যারেল ইভ একজন সফল ইউটিউবার যার প্রায় ৩২ বিলিয়ন ভিউয়ার আছে। তিনি তার অসাধারণ একটি ভাইরাল ভিডিওয়ের জন্য ২০১৫ সালের ‘এড অফ দ্যা ইয়ার’ এওয়ার্ডটি লাভ করেন। তার পরামর্শ অনুসারে নিজের পণ্যের প্রচারের জন্য আপনি বেশ কিছু কৌশল অবলম্বন করতে পারেন। যেমন-

যান্ত্রিকতা বর্জিত ভিডিও আপলোড

আপনাকে অবশ্যই সাবস্ক্রাইবার বাড়ানোর জন্য আকর্ষণীয় কন্টেন্ট তৈরি করতে হবে। কন্টেন্ট যথাসম্ভব প্রাসঙ্গিক রাখতে হবে এবং সুনির্দিষ্ট বিষয়বস্তুর দিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। আপনার কন্টেন্ট যদি শিক্ষণীয় এবং মজার হয়, তবেই মানুষ আপনার চ্যানেলের প্রতি আগ্রহী হবে। আপনার কন্টেন্ট যদি ভালো হয় এবং একঘেঁয়ে না হয়, তাহলে মানুষ অবশ্যই আপনার চ্যানেল নিয়মিত ভিজিট করবে।

দৃষ্টি আকর্ষণ

প্রথম ভিডিও থেকেই মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারলে, পরবর্তীতে দর্শক ধরে রাখা তুলনামূলকভাবে সহজ হয়। এজন্য অবশ্যই ব্যতিক্রমধর্মী ভিডিও আপলোড করা জরুরি।

Source: optinmonster.com

আপনার ভিডিওগুলোতে ক্লিক করার জন্য ইউটিউব ব্যবহারকারীদের উৎসাহিত করার ক্ষেত্রে চিত্র, শিরোনাম এবং বিবরণ অনেক বড় প্রভাব রাখে। এগুলো আকর্ষণীয় করার মাধ্যমে খুব সহজেই মানুষের নজরে আসা যায়। আপনার প্রচারের ক্ষেত্রে যা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

অভিজ্ঞদের পরামর্শ গ্রহণ

নতুন ইউটিউবারদের জন্য এ কাজটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। নিজের কাজের মান যাচাই করার জন্য অভিজ্ঞদের পরামর্শ গ্রহণ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তাই ইউটিউবে অভিজ্ঞতা সম্পন্ন ব্যক্তিদের থেকে পরামর্শ গ্রহণ করুন।

৩. ইন্সটাগ্রাম

ইন্সটাগ্রাম হলো বিশ্বে তৃতীয় সর্বাধিক জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম। ডিজিটাল মার্কেটিংয়ের জন্য এ যোগাযোগ মাধ্যমটিও ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ইন্সটাগ্রামে মার্কেটিংয়ের জন্য শুধুমাত্র পোস্ট করলেই সফলতা অর্জন করা সম্ভব নয়। এজন্য চাই যথাযথ কৌশল অবলম্বন এবং দক্ষতা। অভিজ্ঞদের পরামর্শের আলোকে ইন্সটাগ্রামে সফল হতে আপনি বেশ কিছু বিষয় লক্ষ্য রাখতে পারেন। যেমন-

সঠিক কন্টেন্ট নির্বাচন

ইউটিউবের মতো ইন্সটাগ্রামেও সঠিক কন্টেন্ট নির্বাচন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আপনাকে বুঝতে হবে মানুষ কী চায়, কোন ধরনের পোস্টের প্রতি বেশি আগ্রহী।

Source: simplilearn.com

এসব তথ্য বিশ্লেষণ করে যথাযথ কন্টেন্ট গ্রহণের ফলে, আপনি খুব সহজেই মানুষের মনে জায়গা করে নিতে পারেন; যা আপনার মার্কেটিংকে বেশ খানিকটা এগিয়ে রাখবে। ফলোয়ার যত বাড়বে, আপনার সঙ্গে মানুষের সংশ্লিষ্টতা ততই বাড়বে। একটি খারাপ কন্টেটে ১ মিলিয়ন ভিউয়ের তুলনায় একটি ভালো কন্টেটে ৫০ হাজার ভিউ মার্কেটিংয়ের জন্য বেশি তাৎপর্যপূর্ণ।

ধারাবাহিকতা এবং সম্পৃক্ততা

যেকোনো কাজেই ধারাবাহিকতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইন্সটাগ্রামের বর্তমান এলগরিদমে ধারাবাহিকতা বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। এছাড়াও ইন্সটাগ্রামে সফল হওয়ার অন্যতম চাবিকাঠি হলো সম্পৃক্ত থাকা।

Source: marketingland.com

আপনাকে অবশ্যই মানুষের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকতে হবে। ফলোয়ারের কমেন্টে উত্তর প্রদান এবং নির্দিষ্ট ফলোয়ারদের ছবিতে লাইক দেওয়া ও কমেন্ট করার মাধ্যমে সম্পৃক্ততা বাড়ানো যায়।

বর্তমান ট্রেন্ডের প্রতি বিশেষ নজর প্রদান

আপনি কত দ্রুত বর্তমান মার্কেট প্লেসের ট্রেন্ড সর্ম্পকে অবগত হতে সক্ষম হচ্ছেন এবং তার সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের সংযোগ স্থাপন করতে সক্ষম হচ্ছেন। এই দক্ষতার উপরই আপনার ব্যবসায়িক সফলতা অনেকটাই নির্ভর করবে। তাই সবসময় এ বিষয়ে বিশেষ দৃষ্টি রাখুন।

Source: time.com

সারা বিশ্বে যে সব মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করে, তাদের প্রায় ৭০শতাংশ মানুষ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সংযুক্ত রয়েছে। তরুণ প্রজন্মের প্রায় ৯০শতাংশ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের সঙ্গে সংযুক্ত। বাংলাদেশের ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষেরই ফেসবুক অ্যাকাউন্ট রয়েছে। তাই ফেসবুক, ইউটিউব বা ইন্সটাগ্রামের মতো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো ব্যবহার করে, খুব সহজেই ডিজিটাল মার্কেট প্লেসে আপনি সন্তোষজনক পর্যায়ে যেতে পারেন। তবে এক্ষেত্রে অবশ্যই আপনাকে দক্ষতার সঠিক প্রয়োগ এবং যথাযথ কৌশল অবলম্বন করতে হবে। ধৈর্য, বুদ্ধি আর সৃজনশীলতার মাধ্যমে আপনিও হয়ে উঠতে পারেন একজন সফল ব্যবসায়ী।

Featured Image:Upwork.com

Leave a comment