যারা ব্যবসার সাথে জড়িত আছেন তাদের যদি প্রশ্ন করা হয়, “কেন আপনি ব্যবসা করছেন?” তাহলে তাদের থেকে উত্তর আসবে, “লাভ করার জন্য বা অর্থ আয় করার জন্য।” এটা আসলেই স্বাভাবিক। কারণ যারা ব্যবসা করছেন তাদের ব্যবসার মূল লক্ষ্যই হচ্ছে যতটা বেশি সম্ভব ক্রেতাদের আকৃষ্ট করা ও তাদেরকে উপযুক্ত মূল্যে পন্য বা সার্ভিস বিক্রি করে অর্থ আয় করা। কিন্তু একটা ব্যবসার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি যে বিষয়টার দিকে আমাদের লক্ষ্য রাখতে হয়, সেটা হচ্ছে ‘পণ্যের দাম।’ একটা পণ্যের সঠিক দাম কোনটা আর কত হলে সেই পণ্যটি ক্রেতাদের আকৃষ্ট করবে সেটা আমরা অনেকেই সঠিকভাবে নির্ধারণ করতে পারি না।

সাইকোলজিক্যাল প্রাইসিং দ্বারা আপনার বিক্রি বৃদ্ধি করুন; Source: appseconnect.com

এক্ষেত্রে ব্যবহার করা উচিত সাইকোলজিক্যাল প্রাইসিং। সাইকোলজিক্যাল প্রাইসিং হচ্ছে এমন এক ধরনের মূল্য নির্ধারণ বা মার্কেটিং স্ট্র্যাটেজি, যেটার মূল লক্ষ্যই থাকে সঠিক মূল্য নির্ধারণের মাধ্যমে ক্রেতাদের আকৃষ্ট করা। চলুন আজকে আমরা এই ধরনের মূল্য নির্ধারণের কিছু স্ট্র্যাটেজি সম্পর্কে জেনে নিই, যাতে আমাদের ব্যবসায় সেটাকে কাজে লাগিয়ে আমরা আরো বেশি সংখ্যক ক্রেতাকে আকৃষ্ট করতে পারি।

বর্তমানে সবাই সাইকোলজিক্যাল প্রাইসিং ব্যবহার করছে; Source: mpk732t12016clusterb.wordpress.com

চার্ম প্রাইসিং: মূল দাম থেকে এক বিয়োগ করে দিন

এই সাইকোলজিক্যাল প্রাইসিং স্ট্র্যাটেজিকে মূলত চার্ম প্রাইসিং হিসেবে উল্লেখ করা হয়। যেখানে একটা পণ্যের মূল দামের শেষ সংখ্যাটা ‘৯’ হয়ে থাকে। চার্ম প্রাইসিংয়ে মূলত মোট দামের সংখ্যা থেকে এক বিয়োগ করে সেটাকেই মূল দাম হিসেবে প্রতিস্থাপন করা হয়। আমরা প্রায়ই কিন্তু এই চার্ম প্রাইসিংয়ের ফাঁদে পড়ছি, কখনো জেনে আবার কখনো নিজের অজান্তেই। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ধরুন একটা পণ্যের দাম ৩০০ টাকা। এখন সেটাকে প্রায় প্রত্যেক মার্কেটার বা ব্যবসায়ীরাই চার্ম প্রাইসিংয়ের দ্বারা ২৯৯ টাকা করে বিক্রি করছেন। অর্থাৎ মূল দাম থেকে এক টাকা কমিয়ে সেটাকে মূল দাম হিসেবে ধরে মার্কেটিং করা হচ্ছে। 

মূল্য নির্ধারনে চার্ম প্রাইসিং বেশ কার্যকরী; Source: beyondcostplus.com

ভালোভাবে খেয়াল করলে বুঝতে পারবেন এর পেছনের উদ্দেশ্যটি। আপনার ব্রেইন কিন্তু জানে যে, ৩০০ টাকার চেয়ে ২৯৯ টাকা কম। আর এটারই সুযোগ নিয়ে মার্কেটাররা চার্ম প্রাইসিংকে কাজে লাগাচ্ছে। ২০০৫ সালে থমাস এবং মারউইতজ নামে দুজন রিসার্চার, ‘দ্যা লেফেট ডিজিট এফেক্ট ইন প্রাইস কগনিশন’ নামে একটা রিসার্চে দেখানে যে, মানুষ খুব সহজেই সেসব দামের দিকে এগিয়ে যায় যেসব দামে প্রথম আর শেষের অংক দুটো মূল দামের চেয়ে কম থাকে। অর্থাৎ, ক্রেতারা ৩০০ টাকার পণ্য ২৯৯ টাকায় ক্রয় করতে বেশি আগ্রহ দেখাবে কিন্তু অন্যদিকে একই ক্রেতারা ৩৫০ টাকার পণ্য ৩৪৯ টাকায় ক্রয় করতে চাইবে না।

চার্ম প্রাইসিং সহজেই ক্রেতা আকৃষ্ট করে; Source: blog.invoiceberry.com

প্রেস্টিজ প্রাইসিং স্ট্র্যাটেজি

প্রেস্টিজ প্রাইসিং স্ট্র্যাটেজি মূলত চার্ম প্রাইসিংয়ের সম্পূর্ণ বিপরীত। এক্ষেত্রে যেসব পণ্যের দাম ভগ্নাংশ হয়ে আছে, সেগুলোকে সম্পূর্ন সংখ্যায় রূপান্তরিত করা। অর্থাৎ ২৯৯ টাকার পণ্যের দাম এই প্রেস্টিজ প্রাইসিংয়ের ক্ষেত্রে ৩০০ টাকা করে দেয়া হবে। মজার ব্যাপার হচ্ছে, এই স্ট্র্যাটেজিও বেশ ভালো কাজ করে। ২০১৫ সালে কুয়ানজি শ্যাং ও মনিকা আধওয়া নামে দুজন রিসার্চার একটা গবেষনায় দেখান যে, বিশেষ কিছু ধরনের মানুষ (যেমন: উচ্চ-মধ্যবিত্ত, উচ্চবিত্ত) আছেন ও বিশেষ কিছু পন্য রয়েছে যেখানে মূলত ভগ্নাংশের চেয়ে পূর্ণসংখ্যাই বেশি কাজ করে। 

প্রেস্টিজ প্রাইসিংয়ে উচ্চ-মধ্যবিত্তের ক্রেতাদের আকৃষ্ট করা যায়; Source: pricemole.io

বোগোফ মেথড: বাই ওয়ান, গেট ওয়ান ফ্রি মেথড

এই মেথড বর্তমানে অনেক বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে। এই মেথডে একজন ক্রেতা মূলত কোনো একটি পণ্য সম্পূর্ন দামে ক্রয় করে আরেকটি পন্য বিনামূল্যে পেয়ে থাকে। এক্ষেত্রে যে সাইকোলজিটি কাজ করে সেটা হচ্ছে, লোভ। এক্ষেত্রে একজন ক্রেতা যখন এই অফারটি দেখে তখন মূলত সে মূল পণ্যের চেয়ে বিনামূল্যে থাকা পণ্যের দিকে বেশি আকৃষ্ট হয়, যার ফলে সে এই অফারটি গ্রহণ করতে আগ্রহী হয়। এই অফারকে অনেকভাবেই সাজানো যায়। যেমন,

  • এই পণ্যটি ক্রয় করুন এবং পরবর্তী ক্রয়ে পান ২৫ শতাংশ পর্যন্ত ছাড়।
  • এই পন্যটি ক্রয় করে নিয়ে নিন ৫ হাজার টাকা মূল্যের চারটি পণ্য, সম্পূর্ণ বিনামুল্যে।

এই মেথডের মাধ্যমে সহজেই কাস্টোমারকে আকর্ষন করা যায়; Source: sleeveacademy.com

কম্প্যারিটিভ প্রাইসিং

এটাকে বলা হয়ে থাকে সবচেয়ে বেশি কার্যকরী সাইকোলজিক্যাল প্রাইসিং মেথড। এক্ষেত্রে মূলত একই কোয়ালিটি ও একই রকমের দুটো পণ্য বাজারে দিয়ে, একটার চেয়ে অন্যটার দাম বাড়িয়ে দেয়া। এটাকে যদিও অনেকে ‘সাইকোলজিক্যাল গেইম অফ চয়েস’ হিসেবেও উল্লেখ করে থাকেন। এক্ষেত্রে একজন ক্রেতার কাছে একই ধরণের দুটো পণ্যের চেয়ে, তাদের দামের দিকে বেশি লক্ষ্য করতে দেখা যায়। যার ফলে গড়ে একজন ক্রেতা মূলত যেটার দাম তূলনামূলকভাবে বেশি সেটার দিকে আগ্রহী হয়ে থাকেন। যদিও পণ্যের কোয়ালিটি একই, শুধুমাত্র মূল নির্ধারণের ক্ষেত্রে এই ট্রিকসটি ব্যবহৃত হয়েছে। 

দুটো অপশনের মাঝে পার্থক্য করে দেওয়া হয় দামে; Source: pricing-news.com

পুরনো দাম কেটে দিয়ে নতুন দাম ব্যবহার করুন

অনেক অনলাইন শপেই দেখতে পাবেন যে, তারা আপনাকে পণ্যের দামের জায়গায় পুরনো দাম কেটে দিয়ে নতুন দাম দেখাচ্ছে। এটা বেশ অসাধারন একটি সাইকোলজিক্যাল প্রাইসিং টেকনিক। এই টেকনিকের ক্ষেত্রে আপনি যখন ৫০০ টাকা মূল্যের একটা পণ্যের দাম ১০০০ টাকা দেখাবেন এবং একইসাথে দামের জায়গায় ৭০০ টাকা লিখে সেটা কেটে দেবেন, তখন দেখতে পাবেন যে, আপনার পণ্যের লাভ ঠিকই থাকছে এবং অস্বাভাবিকভাবে ক্রেতারাও বেশি পরিমাণ আকৃষ্ট হচ্ছে। 

পুরনো দামের চেয়ে নতুন দামই আপনাকে আকর্ষণ করবে; Source: beforeworks.com

এক্ষেত্রে আপনাকে পণ্যের রঙ, আকার-আকৃতি এবং দামের পার্থক্যের দিকে নজর রাখতে হবে। অতিরিক্ত পরিমাণ দামের পার্থক্য থাকলে এই মেথড কাজ না করার সম্ভাবনাই বেশি। এই টেকনিকে মূলত ‘ফ্লুয়েন্সি এফেক্ট’ কাজ করে এবং ক্রেতারা তাদের চোখের সামনের দামের পার্থক্য দেখতে পায়। যার ফলে তারা খুব সহজেই নতুন দামের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে পারে ও সন্তুষ্ট হয়ে যায়।  ২০০৫ সালে কেইথ ও রবিন কাল্টার দ্বারা এই পরীক্ষাটি করা হয়। 

Featured Image: competera.net

Leave a comment